• A
  • A
  • A
হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে, তোমায় খুব ভালোবাসি; বলে কোপ প্রাক্তন বিবিকে

কলকাতা, ১৪ ফেব্রুয়ারি : দৃশ্যটা আজও ভোলেননি কমল, জিষ্ণু, বাপ্পারা। ১৪ ফেব্রুয়ারি এলে আরও বেশি করে মনে পড়ে যায় সেই ঘটনার কথা। চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে ভয়ংকর সেই দৃশ্য। ফিনকি দিয়ে এক যুবতির দেহ থেকে বেরিয়ে আসছে রক্ত। আর সেই রক্ত নিজের মুখে মাখছে এক যুবক। রাস্তায় বসে সে চিত্কার করে বলছে, “হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে।”

এই স্থানেই খুন হন জিনাত পরভিন


ঘটনাস্থানের সামনে তৈরি হচ্ছিল আবাসন। চিত্কার শুনে ছুটে এসেছিলেন আবাসনের নিরাপত্তারক্ষীরা। একটু দূরে লন্ড্রির ঝাঁপ বন্ধ ছিল সেদিন। মোটের উপর তিলজলার সেই চত্বরটা ফাঁকাই ছিল সেদিন। যুবকের চিৎকার শুনে যাঁরা ছুটে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিল জিষ্ণু ও তাঁর বন্ধুরা। তখনও চলছিল যুবকের চিত্কার, “তোমায় খুব ভালোবাসি।”


১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫। শনিবার। তখনও হালকা শীতের আমেজ কলকাতায়। প্রেম দিবস উদযাপনে মত্ত জেন ওয়াই। কুষ্টিয়া মোড়ে ফুলের দোকানে গোলাপ কেনার হিড়িক। ২০ টাকা পিস পিছু বিকোচ্ছে ভালোবাসার প্রতীক। আর একটু দূরে এমন ঘটনা ঘটবে কে জানত ? ঘটনাস্থানের একটু দূরে মুদির দোকান রয়েছে অমূল্য মাইতির। বললেন, “আমার দোকানের সামনে দিয়েই গেল ওরা। দু’জনের মধ্যে খুব ঝগড়া চলছিল। আমল দিইনি। এমন তো কতই হয়।”



এই স্থানেই খুন হন জিনাত

ঘটনায় হতচকিত এলাকাবাসীদের কেউ ফোন করেন থানায়। না, যুবকটি পালানোর চেষ্টা করেনি। বরং তার চোখে তখন জল। মুখে ও শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত -- যুবতির। তখনও সে পরম যত্নে ধরে আছে যুবতির নলিকাটা শরীর। পাশে দাঁড়িয়ে একটি শিশু কেঁদে চলেছে অনবরত। শিশুটি এসেছিল যুবতির হাত ধরে। শিশুটির “আম্মা” চিৎকারের সঙ্গে কান্না জানান দিচ্ছিল, এই মাত্র খুন হওয়া যুবতি তার মা।
“স্যার ও আমার বিবি জিনত। মেরে ফেলেছি ওকে। এই ছুরিটা বসিয়ে দিয়েছি গলায়।” অকপট স্বীকারোক্তি যুবকের। চারপাশে ক্রমশ জমে ওঠা ভিড়টা তখন পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। পুলিশও ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ। কান্না জড়ানো কণ্ঠে যুবক বলে, “আমায় গ্রেপ্তার করুন।”


যুবকের নাম শেখ সাবির আলি (২৮)। ঠিকানা গণেশ ঘোষ লেনের কিছুটা দূরে কুষ্ঠিয়া রোডে CESE অফিসের সামনে। আর যুবতির নাম জিনাত পরভিন(২৪)। শিশুটি সাবির ও পরভিনের। প্রেম দিবসে এমন ঘটনার পর তদন্তে নামে তিলজলা থানা। পুলিশ জানতে পারে, তালাক হয়ে গেছে যুগলের। তাহলে তারপরও কেন ঘটল এমন ঘটনা ?

ঘটনার পর পারভিনের দাদা শেখ আবদুল মাজাদ পুলিশকে জানান, সাত বছর আগে নিকাহ হয়েছিল সাবির ও পারভিনের। তখন পারভিন ১৬ কী ১৭। সাবিরও বড়জোর ২১। প্রেম করেই নিকাহ।

যৌবনের স্বপ্নগুলো তখনও রঙিন। তিলজলা ছেড়ে একবালপুরে ছোট্ট একটি ঘরে সংসার শুরু করে নব দম্পতি। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পুত্র সন্তানের মা হন পারভিন। সুখেই কাটছিল দিনগুলো। তবে, হঠাৎই ছন্দপতন। আর্থিক অভাবে সংসারে শুরু হয় অশান্তি। তেমন কিছু করত না সাবির। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। অবস্থা সামলাতে রিক্সা চালাতে শুরু করে সাবির। কিছুটা হাল ফেরে। এমন সময় ফের মা হন পারভিন। এবার কন্যা সন্তান। কিন্তু চিড়ধরা সম্পর্ক জুড়েও জুড়তে চাইছিল না। প্রায় দিনই নেশা করে বাড়ি ফেরা শুরু করে সাবির। প্রতিবাদে করলেই মার খেতে হত পারভিনকে। শেষ পর্যন্ত একবালপুর থানায় ছুটে গিয়েছিল পারভিন। দায়ের করেছিল নির্যাতনের অভিযোগ। তারপরও বদলায়নি পরিস্থিতি। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, একসময় পারভিনকে দেহব্যবসায় নামানোর চেষ্টা হচ্ছে বলেও তাঁর পরিবারের তরফে অভিযোগ করা হয়। এরপর আর সাবিরের সঙ্গে থাকত না পারভিন। ফিরে এসেছিল বাপের বাড়ি।


এখানেই ভিড় জমেছিল
কিছুদিন পর একবালপুর ছেড়ে পৈত্রিক বাড়িতে ফেরে সাবিরও। ততদিনে পারভিনের জীবনে অন্য পুরুষ। সেই খবর পায় সাবির। পারভিনের দাদা পুলিশকে বলে, “সেই খবর পাওয়ার পর সাবির যখন তখন আমাদের বাড়ি এসে চড়াও হত। বলত তোমায় অন্য কারও হতে দেব না। ছেলে-মেয়েকেও কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিত। আমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম এই গন্ডগোলে।”

পুলিশ সাবিরকে জেরা করে জানতে পারে, অন্য পুরুষের সঙ্গে মেলামেশার কথা জানতে পেরেই তার মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। শুরু করে পারভিনকে খুনের পরিকল্পনা। খুনের জায়গা হিসেবে বেঁছে নেয় কিছুটা ফাঁকা গলি তিলজলার গণেশ ঘোষ লেন।

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পারভিনকে ভ্যালেন্টাইনস ডে’তে গণেশ ঘোষ লেনে আসতে বলেছিল সাবির। অনুরোধ ফেলতে পারেনি পারভিনও। গলিপথে ছেলেকে নিয়ে এসেছিল প্রাক্তন শওহরের সঙ্গে দেখা করতে। তখনও ঘুণাক্ষরেও টের পাননি সাবিরের মতলব।



জিনাতের বাপের বাড়ি

প্রত্যক্ষদর্শী কমল, জিষ্ণুরা জানান, তাঁরা কয়েকজন সেদিন দাঁড়িয়ে ছিলেন ওখানে। তাঁদের সামনে দিয়েই পারভিন ও সাবির গিয়েছিল। কথা কাটাকাটি চলছিল। যেখানে আবাসন তৈরি হচ্ছিল সেখানে গিয়ে হঠাৎই ছেলেটা পিছন থেকে আধলা ইট মারে মেয়েটাকে। তারপর এলোপাথারি ছুরির কোপ। কেটে দেয় গলার নলি, আর তার সঙ্গে চিৎকার শুরু করে “হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে।

ঘটনার মাসখানেক পর কবরডাঙার ভাড়াবাড়ি ছেড়ে চলে যায় পারভিনের বাপের বাড়ির লোকজন। তাঁরা এখন কোথায় গেছে জানে না কেউ। আর সাবির... আজ সে জামিনে মুক্ত। তালা বন্ধ অবস্থায় পড়ে থাকে তার ঘর। এখনও রিক্সা চালায় সে। তবে কখন সে বাড়ি ফেরে জানে না কেউ।

ঘটনার পর কেটেছে তিন বছর। গণেশ ঘোষ লেনে এখনও টাটকা সেই স্মৃতি। এখনও সেখানে ১৪ ফেব্রুয়ারি গিয়ে কান পাতলে বুঝি শোনা যায় “হ্যাপি ভ্যালেন্টাইনস ডে। তোমায় খুব ভালোবাসি...।”

CLOSE COMMENT

ADD COMMENT

To read stories offline: Download Eenaduindia app.

SECTIONS:

  হোম

  রাজ্য

  দেশ

  বিদেশ

  ক্রাইম

  খেলা

  বিনোদন-E

  ইন্দ্রধনু

  অনন্যা

  গ্যালারি

  ভ্রমণ

  ଓଡିଆ ନ୍ୟୁଜ

  আয়না ২০১৮

  MAJOR CITIES