• A
  • A
  • A
ইতিহাস ছুঁতে স্বপ্নরাজ্য রোমে...

বাঙালি চিরকালই একটু এক্সপ্লোরেটিভ! পায়ের তলায় সর্ষে।

কলোসিয়াম


বিদেশ যাওয়ার ইচ্ছে আমার অনেক দিনের। ইচ্ছেডানায় ভর করে কতবার যে স্বপ্নলোকে সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়েছি, ইয়ত্তা নেই। খেলা করেছি পেঙ্গুইনের সঙ্গে। যুদ্ধে নেমেছি গ্ল্যাডিয়েটরের সঙ্গে। কলোসিয়ামের মঞ্চে অভিবাদন কুড়িয়েছি দর্শকদের।


চান্স যে চলে আসবে ভাবিনি। অনন্যাকে বলতেই, সেকি উচ্ছ্বাস। একেবারে কিশোরী। ফ্লাইটের টিকিটটা হাতে নিয়ে সেকি নাচ ! বললাম, “যাব সেই কলোসিয়ামের দেশে।”

বাড়ি থেকে বেরিয়ে যতক্ষণে এয়ারপোর্টে পৌঁছলাম ততক্ষণ ভেবেছি, আদৌ যাওয়া হবে তো! কলকাতা থেকে বিমানে দিল্লি। এবার অনুভব করলাম, না যাওয়াটা হচ্ছে।

দুগ্গা দুগ্গা...

আন্তর্জাতিক বিমানে এই প্রথম সফর আমার। দিল্লিতে পা রাখার পরই বললাম, “জানলার ধারে আমি বসব।” অনেকটা শিশুর মত জানলার সিট নিয়ে মারপিট আর কী!


AI-123 Boeing 787 Dream liner । কত ভারী নাম রে বাবা। সিট পড়েছে ১২এ। আট ঘণ্টার যাত্রা। বাইরে সবই দেখা যাচ্ছে। হটাৎ দেখি মেঘে ঢেকে গেল নিচের আকাশ। ভাবলাম,আচ্ছা আমি তো এত ছবি তুলছি, হ্যাংলামি করছি না তো? দেখি তো সবাই কি করছে? এয়ারবাস প্রায় অন্ধকার।


AI-123 Boeing 787 Dream liner-এর অন্দরমহল

ওয়াশরুম থেকে বেরতেই দেখি, ও বাবা, এই ব্যাপার.......এই জন্য কেবিন অন্ধকার.........। প্রত্যেকে হয় সিনেমা দেখছে, না হয় গেম খেলছে। আমি একমাত্র বাইরে ও নিচটা দেখার চেষ্টা করে গেলাম। আর যা দেখলাম তা মনে রাখার মত।

নিচে যেটা দেখা যাচ্ছে, ওটা সিন্ধু নদ। ৩৩ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে যতটা পরিষ্কার দেখা যায়। এই নদী না থাকলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কোন পার্থক্য থাকত না। যদিও এখনও নেই। পার্থক্য একটাই, আফগানিস্তান ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতেনি, আর পাকিস্তান জিতেছে। আর ভারতের পররাষ্ট্রনীতি। নাহলে...AK47... মর্টার... বারুদের গন্ধ... সব এক।


৩৩ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে সিন্ধু নদ

আন্তর্জাতিক বিমানে কোথাও যদি কোনও দিন যান চেষ্টা করবেন অবশ্যই এয়ার ইন্ডিয়াতে যেতে। এর দু’টো কারণ আছে। প্রথমত, যে দেশেই যান, ভারতীয় খাবার পাবেন ফ্লাইটে। যাঁরা অন্য দেশের খাবার খেতে পারেন না, তাদের জন্য এয়ার ইন্ডিয়া মাস্ট। দ্বিতীয়ত, যাঁদের ভাষাগত সমস্যা অর্থাৎ বিদেশে যাচ্ছেন কিন্তু ইংরেজি জানেন না, তাঁরা প্লেন থেকে নেমে কী করবেন, কোথায় যাবেন ইত্যাদিতে সহযোগিতা পাবেন। এয়ার ইন্ডিয়ার কর্মীরা হিন্দিতে আপনাকে সহায়তা করবে।

কথায় বলে "রোম ওয়াজ় নট বিল্ট ইন আ ডে"। আমি বলছি, "রোম ইজ় নট মেন্ট টু বি সিন ইন আ ডে।" আমরা যারা ছবি তুলতে ভালবাসি, চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, তাদের কাছে রোম একদিনে দেখার শহর নয়।


রোমের রাস্তা

রোমের সকালটা ছিল ভারী সুন্দর। সুইটের বাইরে তাকাতেই দেখি রাঙা আকাশ। জবাকুসুমের আবির্ভাব। ভাবলাম, ভোর যদি এত সুন্দর হয় তাবে শহরের প্রকৃতি কত সুন্দর হবে! বিশ্বাস করুন, রোম সত্যি স্বর্গরাজ্য। আর আমার?

স্বপ্নরাজ্য।


তখন ভোর

সকাল হয়েছে। বাসে করে বেরিয়েছি রোমের রাস্তায়। আকাশ দেখে মনে হল, আজ ভোগান্তি আছে। গুমড়ে আছে প্রকৃতি। হোটেল থেকে ১০ মিনিটের পার্থক্যে ২০০০ বছরের পুরোনো রোমান সাম্রাজ্যের নিদর্শন পাবো ভাবিনি। সামনেই যে দেওয়ালটা দেখা যাচ্ছে সেটা রোমান সাম্রাজ্যের নিদর্শন!


গুমড়ে আছে প্রকৃতি...যে দেওয়ালটা দেখা যাচ্ছে সেটা রোমান সাম্রাজ্যের নিদর্শন!

রোম সাম্রাজ্যের খুব বড় এক অংশ এখানে থাকা সাতটা পাহাড়। সেভেন হিলস্ অফ রোম। রোমান সভ্যতার সঙ্গে খুব ওতপ্রোত ভাবে জড়িত মিশরের সভ্যতা। আর তাই পৃথিবীতে একমাত্র মিশরের বাইরে পিরামিড দেখা যায় রোমে। আর একটা জিনিস দেখা যায় রোমে। পৃথিবীর ৭ আশ্চর্যের এক আশ্চর্য। কলোসিয়াম।

কথায় বলে "অল রোড লিডস টু রোম"। আর আমি বলি, “ অল রোমান টুরিস্ট আর লেড টু কলোসিয়াম”। ইট্যালিয়ানরা একটা কথা সবসময় বলে, ইট্যালির স্থাপত্বে রাজার নাম আছে, কিন্তু কারিগরের নাম নেই। কলোসিয়াম কে বানিয়েছিল, কে তার শিল্পী কেউ জানে না। সবাই একটাই কথা জানে, রোমের রাজার প্রমোদ অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি হয় এই কলোসিয়াম।


কলোসিয়াম ....... হিংস্র সিংহের মুখে একজন যোদ্ধাকে ফেলে দেওয়া হল..... আর সেই গ্লাডিয়েটর যুদ্ধ জিতে রাজার কাছে প্রাণ ভিক্ষা পেল, এ কোনও সিনেমার চিত্রনাট্য নয়। আমার স্বপ্নও নয়। এখানে রাসল ক্রো নেই, আছে বাস্তব। এই পর্যন্ত ১০০০ জন এই গ্ল্যডিয়েটর যুদ্ধে মারা গেছেন। ৪০০০ হাজার প্রাণীও।

কলসিয়ামে দুটো গেট আছে। উইন গেট আর ডেথ গেট। বিজয়ীর পথ আলাদা। আর মৃত গ্ল্যাডিয়েটরের শেষ যাত্রার পথ ভিন্ন।

যা দেখলাম, তাতে বলতে ইচ্ছে করে...নিষ্ঠুরতা যে এত সুন্দর হয় জানা ছিল না।

রোমের শুরুটাই একটা গল্প। পরিতক্ত দুই শিশু রিমাস ও রমুলাস। নেকড়ে মায়ের দুধ খেয়ে বেড়ে ওঠা। এঁরাই স্থাপন করেন রোম সাম্রাজ্য। নেকড়ে সেদিন মায়া মমতা দেখিয়েছিল দুই শিশুর প্রতি। কিন্তু মাতৃদুগ্ধ কথা বলে। জীবনজুড়ে। নেকড়ের দুধে ছিল হিংস্রতা। তাই কেন জানি না মনে হয়, রোমের স্থাপত্য যতটা সুন্দর, বিজ্ঞানটা যতটা আধুনিক, মানুষ গুলো দেখতে যেমন সুন্দর, স্বভাবে ততটাই ক্ষিপ্র।

কেন বলছি?



এই ছবিটা দেখুন। এর ইতিহাস হয়তো আমার ব্যাখ্যা থেকে একেবারেই আলাদা। কিন্তু সাধারণ এক মানুষ দেখলে এটাই ভাববে, কালো চাদরে মুখ ঢাকা এক মানুষ। যাঁর তলোয়ার ক্ষিপ্রতার প্রতীক। হাত বাড়িয়ে তিনি ক্ষমতা চাইছেন। ইতিহাসও তো তাই বলে।

রিমাস-রোমুলাস থেকে শুরু করে রোমের গোড়াপত্তন। সিজার থেকে শুরু করে তার পরের প্রজন্ম। একজনকে হত্যা করে অন্যজনের রাজা হওয়া। জিশুর জন্মের আগে থেকে শুরু করে জিশুর মৃত্যুর পরেও। সবেতেই হিংসা থেকেছে। একজন আরেকজনকে ক্ষমতার লোভে খুন করেছে। আর নিজের স্থাপত্বের অনন্য নজির রেখে গেছে। তার পর আবার খুন, আবার স্থাপত্য।

পোপ আসার পরেও গোপনে চলেছে হত্যালীলা। ২০০২ সালে সারা পৃথিবীতে খ্রীষ্টধর্ম অবলম্বীদের শিরদাঁড়ায় কাপুনি ধরিয়ে দিয়েছিলেন ড্যান ব্যাউন। দাঁ ভিঞ্চি কোড, এঞ্জেল্স অ্যান্ড ডেমন্স দেখিয়ে দিয়েছিল ধর্মের আধার কতটা আঁধারে ভরা। কিন্তু ওই যে বাইরেটা খুব সুন্দর।

ওই ছবিটা আমার কাছে অর্থপূর্ণ। ক্ষমতার লোভ! আর সুন্দর স্থাপত্য। রোমের ইতিহাস আমার কাছে এই দুই কথার মাঝে আটকে আছে। যাঁরা চেয়ে এসেছেন, তাঁরা আজও হাত বাড়িয়ে চেয়েই যাচ্ছেন। মূর্তিটা পৃথিবীর বুকে রাজনৈতিক নেতাদের আরাধ্য দেবতা হলে মন্দ হত না!

চলেছি রোমান ফোরামের পথে। ইট্যালির ঠিক মাঝখানে। স্থাপত্যের অনেকটাই কালের গর্ভে বিলীন। তবু ইতিহাস ছুঁয়ে দেখতে হলে যেতেই হবে। বুঝতে পারছিলাম ইতিহাস কেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে রাখে রোমকে। সে যুগে এমন ভাবনা! তারিফ করতেই হয়।

এবার প্যানথীয়নের পথে। প্যানথীয়ন একটি সাবেক রোমান মন্দির। এখন গির্জা। আগের মন্দির অগাস্টাসের রাজত্বকালে স্থাপিত হয়। বর্তমান ভবন সম্রাট হ্যাড্রিয়ানের তৈরি। প্যানথীয়নের স্থাপত্যশৈলি একটা সময় ছিল রহস্য। আজও গোটা দুনিয়ার আর্কিটেক্টদের গবেষণা এবং অনুকরণের বিষয়।

রোমের স্থাপত্য

পাস্তা-পিৎজ়া আর ইতিহাস। কখন যে কয়েকটা দিন কেটে গেল বুঝিনি। রোম ছাড়িয়ে পাড়ি জমিয়েছিলাম ভ্যটিকানের পথে। সে গল্প না হয় আর একদিন হবে।


CLOSE COMMENT

ADD COMMENT

To read stories offline: Download Eenaduindia app.

SECTIONS:

  হোম

  রাজ্য

  দেশ

  বিদেশ

  ব্যবসা-বাণিজ্য

  ক্রাইম

  খেলা

  বিনোদন-E

  ইন্দ্রধনু

  অনন্যা

  গ্যালারি

  ভ্রমণ

  জনমত পঞ্চমত ২০১৮

  MAJOR CITIES