• A
  • A
  • A
"মান্ডু আজও আমাকে টানে"

ঘুরতে ভালোবাসি বলে বন্ধুরা আমার নাম দিয়েছে, “টোটো কম্পানি”। ছবি আঁকা, বই পড়ার মতো আমার আরেক শখ অজানাকে জানা। তাই কাজ থেকে ফুরসত পেলেই বেরিয়ে পড়ি অজানা কোনও ঠিকানার উদ্দেশে। কখনও পরিবারের সঙ্গে, কখনও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে, কখনও বা একাই। গতবছর আমার বন্ধু উপায়নের সঙ্গে হঠাৎ প্ল্যান হল ঘুরতে যাওয়ার। কিন্তু কোথায় যাব, সেই নিয়ে দু’জনে টানাপোড়েনে পড়ে গেলাম। শেষমেশ ঠিক হল ঘুরতে যাওয়া হবে মান্ডু। উপায়ন আবার আর্ট কলেজের শিক্ষক। তাই ইতিহাসের এমন নজির দেখার সুযোগ পেয়ে সে তো আহ্লাদে গদগদ!



কীভাবে যাওয়া হবে, কতখানি সময় লাগবে, সেইসব বৃত্তান্ত আগে থেকেই দেখে নিলাম ইন্টানেটে। প্রথমে হাওড়া থেকে ট্রেনে ইন্দোর, তারপর সেখান থেকে গাড়ি করে মান্ডু। সেইমতো টিকিটও কেটে ফেললাম হাওড়া-ইন্দোর শিপ্রা এক্সপ্রেসের। কিন্তু বেরনোর দিন সে কী বৃষ্টি! থামার নাম নেই। বাবা-মা সকাল থেকেই গজগজ করছিলেন, “এই বর্ষায় কেউ ঘুরতে যায়?” কিন্তু প্ল্যানটা ক্যানসেল করার উপায় নেই। অগত্যা, বাবা-মাকে আস্বস্ত করে বৃষ্টি মাথায় বেরিয়ে পড়লাম। স্টেশনে পৌঁছে দেখি উপায়ন হাজির। বৃষ্টির জন্য ট্রেন ২ ঘণ্টা লেট। একে তুমুল বৃষ্টি, তার উপর ট্রেন লেট। শুনেই দু’জনের এক্সসাইটমেন্ট গলে জল। অবশ্য এমন ভোগান্তির শিকার অনেকবারই হয়েছি। তাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।


দীর্ঘসময় অপেক্ষার পর সন্ধে ৮টা নাগাদ ট্রেন ছাড়ল। পরদিন দুপুরবেলা ইন্দোরে পৌঁছালাম। ইন্দোর থেকে মান্ডু সড়কপথে প্রায় ১০০ কিলোমিটার। প্রাইভেট গাড়ি পাওয়া যায়। আমরাও গাড়ি ভাড়া করে মান্ডুর উদ্দেশে রওনা দিলাম। আগে থেকেই হোটেল বুক করা ছিল, যাতে কোনওরকম অসুবিধায় না পড়তে হয়। হোটেলে ফ্রেশ হয়ে দুই বন্ধু মিলে বেরিয়ে পড়লাম দুর্গ দেখতে। তবে সন্ধের মধ্যে আবার ফিরে আসতে হল। দুর্গ ৭টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। আকাশও মেঘলা ছিল। তাই দেরি না করে তাড়াতাড়ি ফিরে এলাম হোটেলে। তবে অল্প সময়েই মান্ডু দুর্গ সম্পর্কে অজানা অনেক কিছু জানা গেল।


...মান্ডু আগে মান্ধবগড় হিসেবেই পরিচিত ছিল। মধ্যপ্রদেশের পশ্চিমাংশে অবস্থিত এই শহরে একসময় পৃথিবীর বৃহত্তম দুর্গ ছিল। ঐতিহাসিক এই দুর্গনগরীতে পা দেওয়া মাত্র হারিয়ে যাওয়া এক্সসাইটমেন্ট আবার যেন ফিরে পেলাম। বহু ইতিহাস ঘিরে রয়েছে এই শহরটিকে। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমদিকে নির্মাণ করা হয়েছিল দুর্গটি। আগে নাম ছিল মণ্ডপ দুর্গ। মণ্ডপ থেকে এসেছে মাণ্ডব কথাটি। আর সেখান থেকে মান্ডু।

পরদিন সকাল সকাল দু’জনে বেরিয়ে পড়লাম। ৪৫ বর্গমাইল জায়গাজুড়ে বিস্তীর্ণ দুর্গ। একদিনে পুরোটা ঘুরে দেখা মুশকিল। তবে হাতে আরও দুটি দিন বাকি, সেই যা স্বস্তি। দুর্গে প্রবেশ করার জন্য মোট ১২টি প্রবেশদ্বার পেরিয়েছি এক-এক করে। লক্ষ্য করলাম, প্রবেশদ্বারগুলির মজাদার নাম। প্রথমটির নাম দিল্লি দারওয়াজ়া। পরেরটি আলমগির দারওয়াজ়া। শেষটির নাম ভাঙ্গি দারওয়াজ়া। দুর্গের অসাধারণ সব নির্মাণশৈলী দেখে মুগ্ধ হলাম। জানতে পারলাম, দুর্গের অসাধারণ নির্মাণশৈলী দেখে ঐতিহাসিক গুলাম ইয়াজ়দানি “শারাংপুর” বা “আনন্দের শহর” বলে অভিহিত করেন দুর্গটিকে।


বহু ইতিহাসের সাক্ষী মান্ডু। সুলতান, সম্রাট, রাজা, মহারাজারা যুগের পর যুগ ধরে সমৃদ্ধ করেছেন শহরটাকে। বিভিন্ন সময় অসাধারণ সব স্থাপত্য নির্মাণ করেছেন। বইতে পড়া সেই ইতিহাসের চাক্ষুষ প্রমাণ পেলাম। ৭৫টি ঐতিহাসিক সৌধ ছড়িয়ে রয়েছে মান্ডুর বিভিন্ন জায়গায়। বাকি দু’দিন ধরে ঘুরে দেখলাম দুর্গটিকে।

জাহাজমহল মান্ডুর সেরা স্থাপত্য। সুলতান গিয়াসউদ্দিন খিলজী ১৩৬৯ সালে থেকে ১৫০০ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন সেখানে। তিনিই তৈরি করেন এই জাহাজমহল। এই মহলের দু’দিকে দুটি জলাশয় আছে। অনেকটা পুকুরের মতো। একটির নাম মুঞ্জতালাও, অন্যটির নাম কাপুরতালাও। বিশাল সেই প্রাসাদের ছাদে উঠে মনে হল, ঠিক যেন কোনও জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছি। জাহাজমহল থেকে বেশ একটু দূরে হিন্দোলামহল। মহলটির এমন নাম রাখার অবশ্য অন্য কারণ আছে। হিন্দোলা মহলের দেওয়াল ও পিলারগুলিতে এমন কারুকার্য করা, একনজরে দেখে মনে হয় যেন পুরো মহলটাই দুলছে। বালি পাথর দিয়ে তৈরি সেই মহলটির নির্মাণশৈলী দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। মান্ডুর অন্যতম দেখার জায়গা হল হোসনশাহের সমাধিক্ষেত্র। মার্বেল দিয়ে তৈরি সেই স্থাপত্যের সূক্ষ শিল্পকলা নজরকারা, মনোমুগ্ধকর। পাশেই রয়েছে প্রখ্যাত জামি মসজিদ। দামাকাস্কাসের বিখ্যাত মসজিদের অনুকরণে তৈরি সেই মসজিদ। তাছাড়াও, বাজবাহাদুরের প্রাসাদ ও রূপমতী প্যাভিলিয়ন দেখার জায়গা। বাজ বাহাদুর তাঁর স্ত্রী রূপমতীর জন্য সেখানে একটি কুণ্ড তৈরি করেছিলেন। সেই রেওয়াকুণ্ড ঘুরে দেখলাম।

দু’দিনে মান্ডু দুর্গ সম্পর্কে অনেককিছুই জানলাম। কিছুক্ষণের জন্য মনে হল ইতিহাসের সেইসব দিনগুলি যেন ফের জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সবমিলিয়ে মান্ডু ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বেশ রোমাঞ্চকর। উপায়ন শিল্পী মানুষ। মান্ডু দুর্গের শিল্পকলা দেখে সে স্কেচই এঁকে ফেলেছে। ছুটি শেষ। বাড়ির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম রোমাঞ্চে ভরপুর শহরটাকে ছেড়ে। তবে বর্ষাকাল বা শীতকালই মান্ডু ঘুরতে যাওয়ার সেরা সময়। বাকি সময় সেখানে গরম থাকে খুব।

CLOSE COMMENT

ADD COMMENT

To read stories offline: Download Eenaduindia app.

SECTIONS:

  হোম

  রাজ্য

  দেশ

  বিদেশ

  ক্রাইম

  খেলা

  বিনোদন-E

  ইন্দ্রধনু

  অনন্যা

  গ্যালারি

  ভ্রমণ

  ଓଡିଆ ନ୍ୟୁଜ

  পুজোর খবর

  MAJOR CITIES