• A
  • A
  • A
নবাবের শহরে- নবাবি চালে

দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে/তোমা হতে বহু দূরে।/মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে/পার হয়ে আসিলাম.... নবাবের শহরে কবিগুরুর লেখা লাবণ্যর শেষ চিঠির লাইনগুলো বড় প্রাসঙ্গিক মনে হবে আপনার। অনুভব করতে পারবেন সিরাজের সংগ্রাম। “খুনে রাঙা” পলাশির প্রান্তর। যুদ্ধের মৃত্যু মিছিল।

হাজারদুয়ারি

আজিমউন্নিসার সমাধিস্থলেও সেই একই অনুভূতি হবে আপনার। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র বড় মেয়ে আজিমউন্নিসা এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছিলেন। এক কবিরাজের নিদান, খেতে হবে তিন থেকে পাঁচ বছরের একশোটি শিশুর কলিজা! প্রাণ বাঁচাতে বহু নিষ্পাপ শিশুকে বলিদান দেওয়া হয়। “রাক্ষুসে বেগমের” সমাধিস্থলে কানে বাজবে সেই সব শিশুর করুণ আর্তনাদ ।.....মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে/পার হয়ে আসিলাম....।



কাটরা মসজিদ

শুধু ভ্রমণটা দুঃসাহসী নয়। যাওয়া খুব সোজা। একটা উইক এন্ডই যথেষ্ট।

কলকাতা থেকে মাত্র ১৯৭ কিমি। নবাবের শহর মুর্শিদাবাদ। সুবা বাংলার নবাবি ইতিহাসের প্রাণকেন্দ্র। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ়ের তকমাপ্রাপ্ত।

মুর্শিদাবাদ ঘুরতে পারেন বহরমপুরকে কেন্দ্র করে। আবার ডেরা বাধা যায় লালবাগেও। বাংলার নবাবি আমলের রাজধানীতে আজও চলে টাঙ্গাগাড়ি। সারাদিনের জন্য ভাড়া নিয়ে নিন। রেস্ত খুব বেশি খসবে না। মজা পাবেন দেদার। টাঙ্গায় চড়ে বেরিয়ে পড়ুন মুর্শিদাবাদ দর্শনে। ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে।

মুর্শিদাবাদে নবাবি শাসনের শুরুয়াৎ হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ তখন তখতে। মুর্শিদকুলি খাঁর সমাধি থেকেই শুরু করুন ঘোরা। কাটরা মসজিদের পিছনেই সমাধিস্থল। ছুঁয়ে দেখুন ইতিহাস। কাটরা মসজিদের অসাধারণ শিল্পকর্মে আপনি মুগ্ধ হবেন। যদিও ভূমিকম্পে মসজিদটির প্রচুর ক্ষতি হয় । ১৭২৩ সালে মুর্শিদকুলি খাঁ এটি তৈরি করান। মসজিদটিতে ৭০০ জন বসে নমাজ পড়তে পারেন। নবাবের বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হত এই মসজিদ। কালো পাথরের খিলেনে প্রবেশদ্বার। মক্কার অনুকরণে নির্মিত। মসজিদ চত্বরেই রয়েছে একটি শিব মন্দির। সম্প্রীতির এক দুর্লভ ছবি। দেখে নিন ফুটা মসজিদও। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আজ ভগ্নপ্রায় দশা। তবু ইতিহাস দেখতে বেরিয়েয়েছেন তো...। নবাব সরফরাজ় খান নাকি এক রাতেই তৈরি করতে চেয়ে ছিলেন এই মসজিদ। এমনই জনশ্রুতি। মিথ বলে সেই রাতেই আলিবর্দি খাঁ-র চক্রান্তে খুন হন সরফরাজ় খাঁ। অসমাপ্ত থাকে মসজিদ।





এবার চলুন কাঠগোলা বাগান। বাগানের মাঝে আদিনাথের জৈনমন্দিরের শোভা অতুলনীয়। কাঠগোলা বাগানের কেয়ারি করা সৌন্দ্যর্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। এবার আজিমউন্নিসার সমাধিস্থল। অভিশপ্ত এ জায়গা। এখানে আজও কান পাতলে শোনা যায় শিশুহারা মায়েদের হাহাকার।


নবাব নাজ়িম হুমায়ুন খাঁয়ের সমাধি

টাঙ্গা এবার চলুক মুর্শিদাবাদের সেরা আকর্ষণের দিকে। হাজারদুয়ারি। ১৮৩৭ সালে নির্মিত হয় প্রাসাদটি। নবাব নাজ়িম হুমায়ুন খাঁয়ের বাসগৃহ। তিনতলা প্রাসাদ। আদতে ৯০০টি দরজা। তবু হাজারদুয়ারির ভুলভুলাইয়া! ১০০টি কৃত্রিম দরজা আছে প্রাসাদে। প্রাসাদ এখন ইতিহাসের জাদুঘর। নিচের তলে আছে নবাবদের ব্যবহৃত অস্ত্র। রয়েছে সিরাজের তলোয়ার। আছে সেই ছুরিটিও, যা দিয়ে মহম্মদী বেগ সিরাজকে খুন করেছিলেন। দোতলায় আছে রুপোর সিংহাসন। মহারানি ভিক্টোরিয়ার উপহার। মন আপনাকে পৌঁছে দেবে নবাবি আমলে। দেখবেন ১৬১টি ঝাড়যুক্ত বিশাল ঝাড়বাতির নিচে চলছে দরবার। সিংহাসনে বসে নবাব। গায়ে কাঁটা দেবে আপনার। তিনতলায় আছে নবাবী আমলের বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন। আছে সোনা দিয়ে মোড়া কোরান শরিফ। অমূল্য সব পুঁথি। আইন-ই-আকবরির পাণ্ডুলিপি।



হাজারদুয়ারি

হাজারদুয়ারি চত্বরে আছে ১৮ ফুট লম্বা কামান। আট টন ওজন। নাম জাহানকোশা। জনার্দন কর্মকারের তৈরি। এই কামানে একবার তোপ দাগতে ৩০ কেজি বারুদ লাগত! কামানটি পলাশি যুদ্ধের সাক্ষী। নবাবি যুগের ইতিহাস বার বার ফিরে আসবে আপনার চারপাশে।

হাজারদুয়ারির দক্ষিণে মতিঝিল। লেককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পার্ক। সরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা পার্ক এখন মুর্শিদাবাদের বড় আকর্ষণ। লেকের ধারে আছে ত্রিতল প্রাসাদ। প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন আলিবর্দির বড় জামাই নবাব নওয়াজেস মহম্মদ খাঁ। এটিই ঘসেটি বেগমের প্রাসাদ বলেও পরিচিত। মসজিদ লাগোয়া গুপ্তকক্ষে আছে ঘসেটি বেগমের সমাধি।


মতিঝিল চলুন জ়াফরাগঞ্জ দেউড়ি, মীরজ়াফর আর মিরনের প্রাসাদ। জ়াফরাগঞ্জের অর্থ হল বেইমান। এগুলো না দেখলে কি আর নবাবের শহর দেখা হয়? মিরনের এই প্রাসাদেই নাকি সিরাজ-উদ-দৌলা খুন হয়েছিলেন। মহম্মদী বেগের হাতে। এই প্রাসাদে আছে ইংরেজদের কাছ থেকে উপঢৌকন পাওয়া দুটি কামান। বিপরীতের সমাধিক্ষেত্রে শায়িত আছেন মীরজাফর।

মুর্শিদাবাদ থেকে মাত্র ৫৩ কিমি দূরে পলাশির প্রান্তর। সেই আমবাগান। ১৭৫৭ সালে এখানেই অস্ত যায় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য। পরাজিত হন শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদৌল্লা। শত সহস্র বাঙালির খুনে লাল হয় পলাশীর প্রান্তর। .....মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে/পার হয়ে আসিলাম....

মুর্শিদাবাদের অন্যান্য দ্রষ্টব্যের মধ্যে রয়েছে মদিনা মসজিদ, ঘড়িঘর, ননীপুর রাজ প্রাসাদ, জগত শেঠের বাড়ি, হীরাঝিল, কদম শরিফ ইত্যাদি।

কীভাবে যাবেন – নিকটতম রেল স্টেশন বহরমপুর কোর্ট। ধর্মতলা থেকে বাসও যাচ্ছে মুর্শিদাবাদ। ড্রাইভ করে ঘণ্টা চারেকে পৌঁছনো যায় বহরমপুর।

কোথায় থাকবেন –আছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের ট্যুরিস্ট লজ। এছাড়া শহরজুড়ে রয়েছে নানা মান ও দামের অনেক হোটেল।



CLOSE COMMENT

ADD COMMENT

To read stories offline: Download Eenaduindia app.

SECTIONS:

  হোম

  রাজ্য

  দেশ

  বিদেশ

  ক্রাইম

  খেলা

  বিনোদন-E

  ইন্দ্রধনু

  অনন্যা

  গ্যালারি

  ভ্রমণ

  জনমত পঞ্চমত ২০১৮

  ଓଡିଆ ନ୍ୟୁଜ

  MAJOR CITIES