• A
  • A
  • A
মানুষের পুণ্যতীর্থে...

মগনলাল মেঘরাজের খোঁজে নয়। মছলি বাবার শল্কও চাই না। চলেছি মন-মানুষের খোঁজে। বিচিত্রের আহ্বানে।


ভোরের দশাশ্বমেধ ঘাটের স্নিগ্ধতা। গঙ্গারতির তোড়জোড় । ঘুম ভাঙা চোখে পুণ্যার্থীর ভিড়। আঁকাবাঁকা গলিপথ পার হয়ে হাজির আমিও। মানুষের মাঝে। মানুষের ভিড়ে।



ভোরের দশাশ্বমেধ ঘাট
পূব আকাশ রাঙিয়ে আবির্ভূত হন দিবাকর। গাঙের ঘাটে চলে অর্চনা। ওঁ জবাকুসুম সংকাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্ ধন্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণোহতস্মি দিবাকরম্। সঠিক উচ্চারণে।

শুরু হয়েছে গঙ্গারতি। আপন নিয়মে। ছন্দে। সবাই দেখছে মুগ্ধ নয়নে। আমিও।

বড় পবিত্র এই ঘাট। পুরাণ বলছে, রাজা দিব্যদাস এখানেই অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। রাজার আকুতিতে তুষ্ট হন ব্রহ্মা। পুরাণ যোগেই মহাদেব এখানে ব্রহ্মেশ্বর।


গঙ্গার ঘাটে অর্চনা
আরতি শেষে প্রণাম করলাম ভক্তিভরে। অগুনতি পুণ্যার্থীর মতই। এযেন মিনি ভারত। পরিধানে। ভাষার বৈচিত্রে।

মানুষের চেয়ে বিচিত্র কিছু আছে কি? বোধহয় নেই। বিচিত্রের মাঝেই ঘটে অপরূপের দর্শন। একলা থাকার অভ্যেসে ভেবে দেখেছি, বেদনায়-আনন্দে লক্ষ্য করেছি, মানুষই মনের খোরাক। শূন্য মন নিয়ে ছুটে চলেছি। অনবরত। অবিরত।

ভাবনাগুলো দলা পাকিয়ে যাচ্ছিল। সব খেপচুরিয়াস। এলোমেলো।

কোথাও কি আছে শান্তির আশ্বাস?

চড়ে বসেছিলাম পূর্বা এক্সপ্রেসে। মন উতলা। চায় সমর্পন। মনের বোঝাপরায় আকুলতার অঞ্জলি।

ভ্রুক্ষেপহীন যাত্রায় আনমনে দেখেছি স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যাকুলতা। পান থেকে চুন খসার কলহ। আবার স্নেহ-মমতার আশীর্বাণী। বিচিত্র মানুষের অবাক বৈচিত্র...

শ্যামলা বাংলার সীমান্ত ছে্ড়েছি এই মাত্র। পাহাড়ের ল্যান্ডস্কেপে রুক্ষ ধরিত্রী। মানুষের মতই বৈচিত্রের প্রকৃতি। ঋতু বদলায়। রং-রসও।

বিকেলে বারাণসী।

বাঙালির বার্ধক্যের মোক্ষভূমি। শরৎ সাহিত্যের প্লট। বিভূতিভূষনের অপুর এক্কাদোকার দালান। মদনমোহন মালব্যের কর্মকুশলতার সাক্ষী থাকা ঐতিহ্য। আর আমার পুণ্যতীর্থ।


বারাণসীর পরিচিত ছবি

চড়ে বসলাম রিক্সায়। চলেছি দশাশ্বমেধ বোর্ডিং হাউজ়ে। জয় বাবা ফেলুনাথের লোকেশন। বাঙালি খাবারের বারাণসী ঠিকানা। দশাশ্বমেধ ঘাটের ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। শেষ চৌরাহেটা পার হতেই দেখা হল ধর্মের ষাঁড়ের সঙ্গে। বারাণসীর বিখ্যাত। তারপর গলিপথে গন্তব্যে।

উত্তর কলকাতায় বেড়ে ওঠা। গলি নতুন বস্তু নয় আমার কাছে। কিন্তু এই গলিগুলোয় আছে পুরনো গন্ধ। অজানা ইতিহাস।

পুণ্যতোয়া গঙ্গার সান্নিধ্যে কাটল সন্ধেটা। দশাশ্বমেধ ঘাটে। বিচিত্র মানুষের বৈচিত্রে। অন্য কোথাও বেড়াতে গেলে অসহ্য লাগে ভিড়। এখানে যেন মানুষের বিচিত্রতায় প্রাণ পায় শহর। ঘাটগুলো সব গায়ে-গায়ে। শুধু পালটে যায় নাম।

মণিকর্ণিকা, হরিশচন্দ্র, তুলসী, কেদার, পঞ্চগঙ্গা, রাজঘাট......।

পুরাণের মিথ আছেই। তবে ইতিহাস বলছে নাগনৃপতি ভারশিব দ্বিতীয় শতকে এখানে দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। পরপর। তারপর থেকেই নাম হয়েছে দশাশ্বমেধ ঘাট। প্রায় সবকটা ঘাট ঘিরে রয়েছে মিথ আর ইতিহাস।

মানমন্দির ঘাটের পাশেই মানমন্দির। রাজা জয়সিংহের তৈরি। চারশো বছরের পুরনো। মানমন্দিরের ছাদে বিখ্যাত যন্তর-মন্তর। বেনারসের বিখ্যাত বাঁদরদের ঠিকানাও এই ছাদ। ছাদ থেকে গঙ্গার ছবি অনবদ্য।

মণিকর্ণিকা শ্মশানঘাটকে ঘিরে নানা গল্পগাঁথা । এখানেই জলের মধ্যে হারিয়ে যায় দুর্গার মণিকুণ্ডল। অনেক চেষ্টাতেও খুঁজে পাননি। ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন দেবী। রাগের সেই আগুন আজও জ্বলছে। অনির্বাণ সে শিখা।


মণিকর্ণিকা শ্মশানঘাট
পাশেই রানি বৈজাবাঈয়ের মাতৃস্মৃতিমন্দির। মাতৃঋণ শোধের বাসনায় বানানো। অহংকার বাসা বাধে মনে। হেলে পড়ে মন্দির।

মন বলে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু......

রাত নামে। হোটেলে ফেরা।

ভোরের আলোয় দশাশ্বমেধ ঘাট। গঙ্গারতির মুগ্ধতা।

সামনে গঙ্গার বুকে নানারঙের নৌকার সারি। কোনও শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস। চড়ে বসমলাম একটায়। গেলাম ওপারে। পবিত্র গঙ্গার জল এখানে স্বচ্ছ। ওঁ গঙ্গেচ যমুনেচৈব গোদাবরী সরস্বতী........। ডুব দিলাম জলে।

বিশ্বনাথের গলিতে ঢোকার মুখে খাবারের দোকান। ভিতরে ফুল, সিঁদুর, পুজোর সাজির দোকান। মানুষের ভিড়, পাণ্ডা আর দোকানদারদের হাঁকাহাঁকি। আমার অর্চনা ভক্তি। নিজেকে সঁপে দিতেই তো আসা। মন্দিরের সোনার চুড়ো রোদ ঝলমলে। বিশ্বনাথের মন্দিরের স্থাপত্যসৌন্দর্য ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকার মতো। ভেতরে তখন চলছে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ। ভাব গম্ভীর পরিবেশ। নিজের মনেই বলতে শুরু করলাম, ওঁ বিশ্বনাথায় বিশ্বদেবায়.......।


বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়
পুজো শেষ। মন তৃপ্ত। এবার বেরিয়ে পড়া।


চুনার দুর্গ
বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, রামনগর প্যালেস, অন্নপূর্ণা মন্দির, দুর্গা মন্দির। বারাণসী থেকে ৮৬কিমি দূরে সতীপীঠ বিন্ধ্যাঞ্চল। আর ৩৭কিমি দূরে প্রাচীন চুনার দুর্গ। ১০কিমি দূরে বৌদ্ধতীর্থ সারনাথ। সারনাথেই প্রথম বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন বুদ্ধদেব। প্রথম বৌদ্ধমহাধর্মচক্র এখানেই হয়। সম্রাট অশোক গড়ে তোলেন বৌদ্ধবিহার। এখানেই রয়েছে বিখ্যাত অশোক স্তম্ভটি।


বৌদ্ধতীর্থ সারনাথ
শান্ত মন নিয়ে কলকাতায় ফেরা।

কীভাবে যাবেন -- হাওড়া, শিয়ালদা থেকে রয়েছে বহু ট্রেন।

কোথায় থাকবেন-- বহু হোটেল, ধর্মশালা রয়েছে বারাণসীতে।



CLOSE COMMENT

ADD COMMENT

To read stories offline: Download Eenaduindia app.

SECTIONS:

  হোম

  রাজ্য

  দেশ

  বিদেশ

  ক্রাইম

  খেলা

  বিনোদন-E

  ইন্দ্রধনু

  অনন্যা

  গ্যালারি

  ভ্রমণ

  জনমত পঞ্চমত ২০১৮

  ଓଡିଆ ନ୍ୟୁଜ

  MAJOR CITIES