• A
  • A
  • A
ভূতের স্টেশনে এক রাত...

গা ছমছমে পরিবেশ। সন্দেহজনক গন্ধে ভারী হয়ে আসা বাতাস। কারা যেন ফিসফিসিয়ে কথা কয়। নিস্তব্ধতাকে খানখান করে ডেকে ওঠে কালো প্যাঁচা। ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়, “অন্ধকার জমে জমে ভূত হয়।”

বেগুনকোদর স্টেশন


নিকষ তমসা ভেদ করে ছুটে যায় মালগাড়ি। মাটি কাঁপিয়ে। জনমানবহীন চরাচর। অন্তহীন অপেক্ষায় বসে থাকা। শিরা-উপশিরা দিয়ে বয়ে যাওয়া লাভাস্রোত। হয়তো তখনই আপনার ড্রাইভার বলে উঠবে, “ইখানে আর থাকা মুটিই ঠিক হবেক লাই। চল না কেনে চলে যাই। বটে কি?”


শহরে প্রগতির গুঁতোয় ঘরবাড়ি সব ভেঙে চলার ফলে “তেনাদের” থাকার জায়গায় টান পড়েছে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের আদি গঙ্গার আশপাশ বা উত্তর কলকাতার কানা গলির ভূতেরাও এখন পাড়া ছাড়া। ত্রিফলার গুঁতোয় সংকট বিপদ সীমার উপরে। এখানে কিন্তু “তেনারা” নিশ্চিন্তেই আছেন। প্রায় ৫০ বছরের ইতিহাসে। বহাল তবিয়তে। কাদের যেন দেখাও দিয়েছেন।

পুরুলিয়া স্টেশনে নামলেই শুনতে পাবেন হাতে গরম সব তথ্য। অশরীরীদের নানা কাহিনি।

“... উকেনে উয়ারা থাকেন। রেতে নাম করতে লাই। ভূতের ইস্টিশনে লাইন পার হয় সাদা শাড়ি। উই যে গো উই মেয়াটা ট্রেনে কাটা পইড়ে ছেল?.....উয়ার আত্মা শান্তি পায় লাই। যেকেনে কাটা পুইড়েছেল ঠিক সেকেন দিয়ে লাইন টপকায়। অনেকেই দিকেচে গো। অনেকেই দিকেচে।”

আবার অন্য কাহিনিও আছে। শোনা যায় এক স্টেশনমাস্টার ও তাঁর স্ত্রী খুন হন ওখানে। কুয়োর মধ্যে পাওয়া যায় লাশ। তারপর থেকেই ভূতেদের আড্ডা !



এ এক স্টেশন। ভূতের স্টেশন! নাম বেগুনকোদর। নানা ভূতের সাকিন নাকি এখানে। তবে ঠিক কোন কোন ভূত আছেন এখানে, তা বলা মুশকিল।ভূত বিলাসিতার জন্য এখন বেরিয়ে পড়ুন। বিকেল বিকেল। লোকাল ড্রাইভার নিমরাজি হতে পারে। রাজি করিয়ে নিন।

পুরুলিয়া সদর থেকে খুব বেশি পথ নয়। ভূত ভ্রমণের হট ডেস্টিনেশন কাছেই। বেরিয়ে পড়ুন লাঞ্চ সেরেই। দক্ষিণ-পূর্ব রেলের রাঁচি ডিভিশনের বেগুনকোদর স্টেশন যেতে লাগবে কমবেশি একঘণ্টা। এখানে পৌঁছে আপনি মুগ্ধ হবেনই।

এ এক অসাধারণ পরিবেশ। একদিকে সবুজ প্রান্তর। তার সীমানায় পাহাড় পাঁচিল তুলেছে। বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে সবুজ পাহাড়। কুয়াশার ফিনফিনে চাদর যেন রেড কার্পেটের অভ্যর্থনা জানায়। উলটোদিকের দিগন্তেও পাহাড়ের রেখচিত্র। পাথুরে ঘাস জমিতে অচেনা গন্ধ। পরিবেশের মুগ্ধ করা রূপ। ভূত বাদ দিন। এমন পরিবেশে এমনিই কাটানো যায় দু’টো দিন।



এমনিতে এ তল্লাটে প্রয়োজন ছাড়া পা মাড়ান না স্থানীয়রা। ভূতের নাম শুনে এই স্টেশন দেখার জন্য ভিড় জমাচ্ছেন বহু মানুষ। ভূতের বাড়ি দেখার শখ যাঁদের ষোলোয়ানা। বাস্তবে এখানে ভূত আছে কি না তা নিয়ে চিন্তা করবেন ভূত বিশেষজ্ঞরা। তবে দক্ষিণ-পূর্ব রেলের পুরুলিয়া-কোটশিলা-মুরি শাখায় রয়েছে বেগুনকোদর স্টেশনটি। চারপাশ সুনসান। তারমধ্যে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে স্টেশন বাড়িটি। ভুত আস্তানা। আধারে আলাদা রোমাঞ্চ আনে বাড়িটা। জনমানবহীন প্রান্তরে হাওয়ার দাপট। দমকা হাওয়া দেওয়ালের গায়ে ধাক্কা মারে। মনে হয় যেন হাহাকার করছে কোনও অতৃপ্ত আত্মা।

কোটশিলা। এক সময়ের মাও ডেরা। এখানেই বেগুনকোদর। কোনও এক সময় ছিল একট পূর্ণাঙ্গ স্টেশন। কবে? মাথা চুলকোন বুধিয়া শবর। স্থানীয় বাসিন্দা। তবে অশীতিপররা বলেন, বড় স্টেশন বিল্ডিং, রেল কোয়ার্টার, এমনকী বাজারও ছিল এখানে। থামত সব প্যাসেঞ্জার ট্রেন। গমগম করত বেগুনকোদর। স্টেশন বাড়িটাও।
“স্টেশন বাবুরা” থাকতেন পরিবার নিয়ে। মারাং গুরুর পুজোয় মাততেন গ্রামবাসীদের সঙ্গে। দীপাবলিতে “পিদিমের” আলোয় সাজত স্টেশন বাড়িটা।

তারপর হঠাৎ কী সব হয়ে গেল।

শোনা যায়, একদিন স্টেশন মাস্টার ও তাঁর স্ত্রী খুন হন। কুয়োয় পাওয়া যায় লাশ। তারপর থেকেই নাকি ভূতেদের আড্ডা। পালিয়ে যান রেলকর্মীরা। ট্রেন আর থামত না। মুখে মুখে ছড়াল ভূত-আখ্যান। জানলেন রেলের ছোটো-বড় কর্তারা। রেলের পাইলটরা কোনও রকমে ট্রেন নিয়ে পালাতেন। এভাবেই একদিন বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেল স্টেশন। শুধু একলা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বিল্ডিংটা। মূর্তিমান বিভীষিকার মত।



তারপর বামনির ঝরনা ঝরিয়েছে অনেক জল। অধুনা বেগুনকোদর বুঝেছে স্টেশনের গুরুত্ব। ভরসা বাড়িয়েছিলেন প্রাক্তন রেলমন্ত্রী বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেছিলেন, “আমি ওসব ভূতুড়ে গল্পে বিশ্বাস করিনা।” শুরু হয় ট্রেন থামানোর আন্দোলন। উদ্যোগী হন বাসুদেব আচারিয়া। শেষে ২০১০ সালে আবার খোলে বেগুনকোদর স্টেশন।

দ্বিতীয় পর্বের বেগুনকোদর স্টেশন উদ্বোধনের সময় রেলের সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান বাসুদেব আচারিয়া মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন, রেলকর্মীরাই ভূতের গল্পটি বানিয়েছিলেন। যাতে তাঁদের এই নির্জন স্টেশনে পাঠানো না হয়।

২০১০-এ অভিশপ্ত বিল্ডিংটাকেই রং-টং করে সাজিয়ে দেওয়া হয়। তিনটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন দাঁড়াত। তারপর থেকে বেগুনকোদর স্টেশন খোলা।

তবে না, ভূতের সে আতঙ্ক নাকি এখনও তাড়া করে বেড়ায়।

এখনও সন্ধের পর সুনসান হয়ে যায় এ চত্বর। বিকেল পাঁচটা পঞ্চাশে স্টেশনে থামে রাঁচি-চন্দ্রপুরা-ধানবাদ প্যাসেঞ্জার। এখন যোগ হয়েছে ন’টার আসানসোল-বোকারো প্যাসেঞ্জার। ব্যাস, আর কোনও ট্রেনের স্টপেজ নেই। শেষ ট্রেনের পর বাড়ি চলে যান টিকিট এজেন্টও। এরপর অন্ধকারে পড়ে থাকে বিল্ডিংটা। স্থানীয় মানুষ রাতে এড়িয়েই চলেন ওই পথ। গাঢ় অন্ধকারে স্টেশন বিল্ডিং কাঁপিয়ে পার হয় একের পর মেল-এক্সপ্রেস ও মালগাড়ি। চালকরা লম্বা হুইসল দিয়ে পার হন স্টেশন ।

অতিপ্রাকৃত এক আভাস। আর তার জন্যই পুরুলিয়ায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে বেগুনকোদর স্টেশন, বর্তমানে দর্শনীয় স্থান। পুরুলিয়া শহর থেকে পর্যটকদের নিয়ে প্যাকেজ টুর করেন মহঃ সরফরাজ়, রুমেল, কচ্ছপরা।

পর্যটকদের কাউকে স্টেশনমাস্টার ও তাঁর স্ত্রী দেখা দিয়েছেন কি না জানা নেই। সাদা শাড়ির অতৃপ্ত আত্মার দেখা পাওয়া নিয়ে কোনও ব্লগও চোখে পড়বে না সম্ভবত।

৪০ বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে। ঘটনার স্মৃতিপটে ধুলো জমেছে। বিছিয়ে দেওয়া ভৌতিক সাদা চাদরটা কিন্তু সরেনি। ঠিক কী হয়েছিল সে সময়? কে খুন করেছিল সস্ত্রীক স্টেশনমাস্টারকে? কি বলছে গবেষণা?

সে রহস্য এখনও রহস্যই।


CLOSE COMMENT

ADD COMMENT

To read stories offline: Download Eenaduindia app.

SECTIONS:

  হোম

  রাজ্য

  দেশ

  বিদেশ

  ক্রাইম

  খেলা

  বিনোদন-E

  ইন্দ্রধনু

  অনন্যা

  গ্যালারি

  ভ্রমণ

  ଓଡିଆ ନ୍ୟୁଜ

  পুজোর খবর

  MAJOR CITIES