• A
  • A
  • A
ট্রেক-পথে সান্দাকফু

তবে কি পথ হারাল বুড়ো ? ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকটা।

পাহাড়ের প্যানোরামা ভিউ


শুরু হল খোঁজ। এ পথের বিপদ কম নয়। পথ ভুললেই নেপালের জঙ্গল। সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্কে আছে ভাল্লুক। আরও অনেক কিছুই।


গাইড সুরজ দ্রুত সেঁধিয়ে গেল জঙ্গলে। টিপ-টিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আকাশের মুখ ভার। মনের ভেতর কু-ডাক। রেইনকোটটা চপিয়ে নামতে শুরু করলাম ফেলে আসা পথে। বৃষ্টিতে পথ পিছল। সাবধানে পা ফেলতে হবে। আমি গাড়ির রাস্তা ধরে। শ্রীজয় ট্রেক রুটে। দু’জনেই গলা ছেড়ে ডাকছি। আদরের নাম তখন উধাও ।

-বিশ্বজিৎ দা..আ...আ........


ট্রেক-পথ

হঠাৎ হাজির সুরজ। সুখবর শোনাল না। বলল, “জঙ্গল মে নেহি। আপলোগ সাবধানি সে উপর চড়িয়ে। স্যাক হামে দিজিয়ে। হাম গাড়ি মে যা রাহা হ্যায়।”

বলেই দে ছুট।

বৃষ্টি নামল ঝমঝমিয়ে। দৃশ্যমানতা তলানিতে। রেইনকোটে মানছে না জল। গায়ে জড়ালাম প্লাস্টিক। একদিকে অতল খাদ। অপরদিকে ঘন জঙ্গল। জনমানবহীন পথে চলেছি দুই বন্ধু। কারও মুখে টুঁ শব্দটুকুও নেই। অজানা আশঙ্কায় উদগ্রীব বিষণ্ণতা।

প্ল্যান হয় হঠাৎই। একদিন রাতের আড্ডায়। আমি আর শ্রীজয়। এবার সান্দাকফু। ট্রেক পথে। সেটা এপ্রিল।

দশদিনের ছুটি ম্যানেজ করতেও অসুবিধা হয়নি। সঙ্গ নিল নাছোড় বিশ্বজিৎদা। আমাদের “বুড়ো”। বয়স ৪৮।

এই বয়সে ট্রেক! মানা করেছিলাম। শোনেনি। আগেও নাকি একবার চেষ্টা করেছিল। ফিরতে হয়েছিল মাঝপথে। তাই যাবেই। অগত্যা...

শতাব্দী এক্সপ্রেস। রাতেই শিলিগুড়ি। পরের দিন ভোরে বেরবার প্ল্যান। আমার পাহাড় পথের সারথি শ্যামকে বলা ছিল।

ভোর সাড়ে চারটেয় হাজির শ্যাম। দুগ্গা দুগ্গা.....

কার্শিয়ং হয়ে সোজা মিরিক। ঘুম ভেঙেছে পাহাড়ের। পথে ধূমায়িত চা আর থুপ্পা। পেট্রল নিয়ে ফের ছুটল গাড়ি। ঠান্ডা হাওয়ায় শীতের আমেজ। মাথা তুলে দাঁড়ানো পাইনের সারি। মেঘ-কুয়াশার লুকোচুরি।


মেঘ-কুয়াশার কার্শিয়াং
শ্রীজয়ের ক্যামেরা ছবি তোলে ফটাফট। মন ক্যামেরাও।

পৌঁছলাম মানেভঞ্জন। সান্দাকফুর বেসক্যাম্প। ঠিক হল গাইড। রোজ চারশোর চুক্তি। সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়া। গন্তব্য চিত্রে। উদ্দেশ্য অ্যাক্লাইমেটাইজ়েশন।

খাড়াই পাহাড়। দশ পায়েই হাঁফ ধরে। জিরিয়ে নিয়ে ফের হাঁটা। পথে পাখিদের কূজন। ডেকে ওঠে জঙ্গল ব্যাবলার। দূর পাহাড়ে নেপালের গাঁ। ছবির মতো। ঘনঘন হেয়ারপিন বেন্ট। হার্টবিট সপ্তমে। শেষ ২ কিমি আরও কঠিন।


চিত্রে

চিত্রের চিত্রপট চোখের সামনে। ফ্রেমে বাঁধানোর মত। ৭,২০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ি গ্রাম। দু-চার ঘর বসতি। ঠাঁই হল হোমস্টেতে।

ঘাস মখমল চিত্রের বিকেলের আড্ডা জমে ক্ষীর। রং ঢালা আকাশে অস্ত যায় জবাকুসুম। আপন নিয়মে।


চিত্রের চিত্রপট

পরের দিন ভোর পাঁচটায় যাত্রা শুরু। খাড়া পাহাড় পার হয়ে লামেধুরা। একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। চা সেরে ফের হাঁটা। পথ প্রকৃতি মন ভোলানো। মালুম হয় না পথকষ্ট। অনাবিল সৌন্দর্যে সবুজ চরাচর। ফ্রেমে বাঁধানো ছবির কোলাজ।


মেঘমায় রঙের খেলা

এলাম মেঘমা। সুরজ বলল, এটা পাহাড়ের খুন হওয়া নেতা মদন তামাংয়ের আপনভূম। উনি এখানকার রাজা ছিলেন। ডানদিকের পাহাড়খাদে ছোট্ট গ্রাম। গাঁয়ের মাথায় মেঘ জমেছে। অপূর্ব সে দৃশ্য। এবার এগিয়ে চলা। পৌঁছলাম টুমলিং। উচ্চতা ৯,৫০০ ফুট। ফের হোম স্টে। ঘরে রুকস্যাকটা ফেলেই কিচেনে। পেটে ছুঁচোদের দাপাদাপি। গরম খিচুড়ি, আচার আর পাঁপড়ভাজা। অমৃত। বিকেলে গেলাম টংলু টপ। মনটা খারাপ হয়ে গেল। চারিদিকে মেঘ জমেছে।


টুমলিং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা

টুমলিং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য অসাধারণ। কিন্তু কপাল খারাপ। পরের সকালও মন খারাপের। দেখা হল না “স্লিপিং বুদ্ধের” সঙ্গে। টুমলিং পেছনে ফেলে এগিয়ে চলা। এবার সিঙ্গলিলা ন্যাশনাল পার্কের শুরুয়াত। টিকিট কেটে এগিয়ে চলা। সন্তর্পণে।


টংলু টপ
কেটেছে মেঘ। আফশোস হচ্ছিল টুমলিংয়ের জন্য। পথে জৌবাড়ি। নেপালি গ্রাম। আমরা এখন নেপালে। ছোট্ট চায়ের দোকান। স্যাকটা নামিয়ে চায়ের অর্ডার। ডাক দিল সুরজ। অনুসরণ করলাম।

চমক ! চোখের সামনে এভারেস্ট ! আমি বাকরুদ্ধ। দৃশ্যটা মণিকোঠায় বন্দি থাকবে আজীবন।


পাহাড় চড়া

জৌবাড়ি ছেড়ে ডানদিকের পথ । পথে নেপালিদের আনাগোনা। খচ্চরে বোঝাই মাল । জীবনধারণের কষ্টার্জিত রসদ। কঠিন চড়াই পথ পার হয়ে এগিয়ে চলা। উতরাইয়ে নেমে গৈরিবাস। এখানে আছে ট্রেকার্স হাট, এস এস বি ক্যাম্প আর টিফিন করার মত একটা দোকান। নুডুলস খেয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। এবার রীতিমতো ক্লাইম্ব। পথে ঘন জঙ্গল। কিছুটা উঠে দু’ভাগ হয় পথ। একটা ঘুরপথে। তুলনামূলক সহজ। অন্যটা কঠিন কিন্তু শর্টকাট। আমি আর শ্রীজয় বেছে নিলাম পরেরটা। বুড়ো প্রথমটা। পথদুটো মিশবে কয়াকাটায়। ঠিক হল সেখানেই আমরা অপেক্ষা করব।

এখানেই হারিয়ে যায় বিশ্বজিৎদা।

অঝোর বৃষ্টি। আমরা অজানা আশঙ্কায় চলেছি পাহাড়িপথে। পৌঁছলাম কালিপোখরি। সুরজ দাঁড়িয়ে পথে। দিল খুশির খবরটা। বুড়ো সোজা চলে এসেছে এখানে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। শরীরটা জমে যাবে মনে হল। আরও বাড়ছে দুর্যোগ। কোনও রকমে পৌঁছলাম রাত্রিবাসের ঠিকানায়। কয়লার গনগনে আঁচে সেঁকে নিলাম হাত পা। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে কিছুটা ধাতস্থ হলাম। বুড়োর সঙ্গে ঝগড়াও হল খানিক। জানতে চাইলাম কেন থামেনি কয়াকাটায়। বলে দিলাম এটা ট্রেকিংয়ের নীতি বিরুদ্ধ ।

পরের সকাল আলো ঝলমলে। কে বলবে রাতভর চলেছে দুর্যোগ। পোখরি শব্দের অর্থ পুকুর। বড় পবিত্র এই কালিপোখরি। ১০,২০০ ফুট উচ্চতায় এই পোখরির সৌন্দর্য অনবদ্য। ফের যাত্রা শুরু। এবার পাহাড় জুড়ে রংয়ের খেলা।

রডোডেনড্রন !

অনুভূতি লেখার ক্ষমতা আমার নেই। হারিয়ে গিয়েছিলাম সে সৌন্দর্যে।


রডোডেনড্রন
টানা চড়াই ট্রেক। পৌঁছলাম সান্দাকফু। এ যেন আট হাজারি শৃঙ্গ জয়ের আনন্দ।

ফের খারাপ হল আবহাওয়া। ট্রেকার্স হাটে বন্দি হয়েই কাটালাম বিকেলটা। মন খারাপের বিকেল।

পরের সকাল কুয়াশামোড়া। পাহাড়ের প্যানোরামা ভিউ আর ভাগ্যে হল না। ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম। দেখি পর্দা সরিয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। সপারিষদ হাজির কাবড়ু।


কাঞ্চনজঙ্ঘায় রঙের খেলা

সার্থক সান্দাকফু অভিযান।


শেষ ল্যাপের শ্রিখোলা ব্রিজ

ফেরার পথে ক্রমশ ডি-ফোকাসড হচ্ছিল সান্দাকফু টপের বোর্ডে লেখা সেই লাইন দুটো...

“ Take nothing but memories
Leave nothing but footprint”


CLOSE COMMENT

ADD COMMENT

To read stories offline: Download Eenaduindia app.

SECTIONS:

  হোম

  রাজ্য

  দেশ

  বিদেশ

  ব্যবসা-বাণিজ্য

  ক্রাইম

  খেলা

  বিনোদন-E

  ইন্দ্রধনু

  অনন্যা

  গ্যালারি

  ভ্রমণ

  জনমত পঞ্চমত ২০১৮

  MAJOR CITIES