• A
  • A
  • A
ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারি..মাঝে গহন অরণ্য ; ঘুরে আসুন অযোধ্যা

সে প্রায় ৫ বছর আগের কথা। সেই প্রথম পুরুলিয়ায় শুটিং করতে আসেন বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ। “শূন্য অঙ্ক” নামে সেই ছবির একটা বড় অংশই তোলা হয় পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে। সময়টা ছিল বর্ষাকাল। শুটিং চলছে অযোধ্যা পাহাড়ের একেবারে উপরে উশুলডুংরি গ্রামের কাছে। বর্ষার ঘন মেঘে ছেয়ে গেছে চারিদিক। হঠাৎ ক্যামেরার আই পিস থেকে চোখ সরিয়ে তন্ময় হয়ে দূরে তাকিয়ে রইলেন পরিচালক। নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠলেন “অপূর্ব”। বাস্তবেই দক্ষিণবঙ্গের সবথেকে বড় পাহাড়শ্রেণি অযোধ্যা পাহাড় দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না।


ছোটনাগপুর মালভূমির অন্তর্গত পুরুলিয়া জেলার সবথেকে বড় পাহাড়শ্রেণি হল অযোধ্যা। এই পাহাড়ে রয়েছে অনেকগুলি চূড়া। তার মধ্যে গর্গাবুরু হল সর্বোচ্চ। ৮৫৫ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট গর্গাবুরু সারা দক্ষিণবঙ্গের মধ্যেও সবথেকে উঁচু শৃঙ্গ।


কথিত আছে, এই পাহাড়ে এসেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। দেবী সীতার জল তৃষ্ণা পেলে রামচন্দ্র তীর ছুঁড়ে পাহাড়ের বুক চিরে বের করেন জল। হিলটপের কাছে সেই জায়গাটি সীতাকুণ্ড নামে পরিচিত। এই কুণ্ডয় মাটির ভিতর থেকে অবিরাম জলের ধারা বেরিয়ে আসছে। প্রচণ্ড গরমে পাহাড়ের নলকূপ ও কুয়াগুলিতে জল না পাওয়া গেলেও সীতাকুণ্ডয় জল পাওয়া যায়।



বিজ্ঞানীদের কথায়, এটি একটি আর্টেজিয় কূপ। বর্ষাকালে ঘোলা জলে ঢেকে যায় সীতাকুণ্ড। বর্ষায় জলে ভরে যায় পাহাড়ের সব নদী ও প্রস্রবণগুলিও। কান পাতলেই চারিদিক থেকে শোনা যায় জলধারার শব্দ। পাহাড়ের বামনি ঝরনা ও টুর্গা ঝরনা এসময় যেন পাগল হয়ে ওঠে। হিলটপের কাছের রাস্তায় ভাগ্য একটু সুপ্রসন্ন থাকলে দেখা মেলে মেঘের। গর্গাবুরু ছাড়াও এখানে রয়েছে গজাবুরু, মাঠাবুরু রটাবুরুর মতো উঁচু শৃঙ্গও। উত্তুঙ্গ পাখি পাহাড় অযোধ্যার একদিকে থাকলেও এই জায়গাটিও পর্যটকদের কাছে দারুণভাবে জনপ্রিয়। স্থানীয় মানুষ অবশ্য এই জায়গাটিকে মাঠা বনাঞ্চল বলেন। সবুজে ঢাকা পাহাড়শ্রেণির এদিক ওদিক ছড়ানো রয়েছে আদিবাসী গ্রামগুলি। ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারির ভিতর কোথাও ছাড়া ছাড়া জঙ্গল কোথাওবা শালগাছের গহন অরণ্য। বর্তমানে সার্কিট টুরিজ়মের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে অযোধ্যা। পাহাড়ের হিলটপ থেকেই পর্যটকরা ঘুরে দেখছেন গর্গাবুরু, ময়ূর পাহাড়, মার্বেল রক, আপার ড্যাম ও লোয়ার ড্যাম।

এরপর রয়েছে ঝর্নার সৌন্দর্য। বামনি ফলস, টুরগা ফলস ছাড়াও অযোধ্যায় রয়েছে অজস্র পাহাড়ি ঝোরা। রয়েছে বান্দু ও শোভার মতো দুটি পাহাড়ি নদী। অযোধ্যার অরণ্যে এখনও সভ্যতার সঙ্গে লড়াই করে এখানে অস্তিত্ব বজায় রেখেছে চিতাবাঘ, হায়না, জঙলি কুকুর, বুনো শুয়োরের মতো বন্যপ্রাণ। পাহাড়ে ঘুরলে দেখা মেলে হরিণ, খরগোশ, বনমুরগি এবং ময়ূরের।



পুরুলিয়া শহর সহ আশপাশের শহরগুলি থেকে বহু মানুষ প্রায় প্রতিদিনই বাইকে করে পাহাড়ে যান। প্রত্যেক ঋতুতেই অযোধ্যার আলাদা আলাদা রূপ প্রত্যক্ষ করা যায়। বর্ষায় যা হয়ে যায় ঘন সবুজ। বসন্তে সেই পাহাড় ঢেকে যায় পলাশের আগুন রঙে। গ্রীষ্মে তার রূপ আবার রুক্ষ। পাহাড়ের একেক রকম রূপ দেখতে এখন বছরভর ভিড় জমান পর্যটকরা।

অতীতে মাওবাদীদের আতঙ্ক থাকলেও এখন অযোধ্যা সম্পূর্ণ নিরাপদ। প্রকৃতিপ্রেমীরা এখানে এসে নিজেদের মতো করে যেখানে খুশি ঘুরতে পারেন। রয়েছে গাইড। পাহাড়ের যে জায়গাগুলি সবথেকে বেশি মোহময় সেখানে ঘোরার জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।

অযোধ্যা হিলটপের হোটেল ব্যবসায়ী অখিল সিং সর্দারও বলেন, “আগের তুলনায় অযোধ্যা পাহাড়ে পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। কলকাতা ছাড়াও পাশের ঝাড়খণ্ড রাজ্য থেকেও অনেকে আসছেন।”

অযোধ্যা হিলটপে সবথেকে বেশি অতিথি আবাস রয়েছে রাজ্য সরকারের অধিগৃহীত সংস্থা সামগ্রিক অঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদ বা CADC-র। নীহারিকা ও মালবিকা CADC-র এই দুটি আবাস রয়েছে একেবারে হিলটপ বা পাহাড়ের একেবারে কেন্দ্রস্থলে। ডরমিটরি ছাড়াও এই আবাসগুলিতে আছে ডবল বেড(সাধারণ), বাতানুকূল এমনকী ডিলাক্স সুইট। ভাড়া ৮০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে। রয়েছে রাজ্য সরকারের আরও কয়েকটি অতিথি আবাস। লিজে দেওয়া এই অতিথি আবাসের ভাড়া ১৫০০-৩০০০ টাকা। বন দপ্তরের বাংলোও রয়েছে থাকার জন্য।

সম্প্রতি বেসরকারি উদ্যোগেও গড়ে উঠেছে কটেজ ও টেন্ট। পুরুলিয়া ও কলকাতা থেকে এখানে অগ্রিম বুকিং করা যায়। হিলটপে থেকে মাত্র দুদিনেই ঘুরে নেওয়া যায় পাম্প স্টোরেজ বিদ্যুৎ প্রকল্পের আপার ও লোয়ার ড্যাম। তিনটি পাহাড়ের কোলে থাকা কয়রাবেড়া ড্যাম। যাওয়া যেতে পারে মুরগুমার জঙ্গল ও জলাধারেও। পথে যেতে যেতেই ঘুরে নেওয়া যায় মুখোশের গ্রাম চড়িদায়।

প্রতিদিন সকালে ও দুপুরে পুরুলিয়া বাস স্ট্যান্ড থেকে ছাড়ছে দুজোড়া দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার বাস। এছাড়াও যাচ্ছে প্রচুর বেসরকারি যানবাহন। কলকাতা থেকে পুরুলিয়া ও সরাসরি অযোধ্যা পাহাড় যাওয়ার জন্য রয়েছে বাস ও ট্রেন। দক্ষিণবঙ্গ রাজ্য পরিবহণ সংস্থার একাধিক বাস কলকাতা ও পুরুলিয়ার মধ্যে চলাচল করে। এছাড়া রয়েছে হাওড়া পুরুলিয়া এক্সপ্রেস, হাওড়া পুরুলিয়া লালমাটি এক্সপ্রেস (দ্বিসাপ্তাহিক), হাওড়া-পুরুলিয়া-চক্রধরপুর ফাস্ট প্যাসেঞ্জার, সাঁতরাগাছি-পুরুলিয়া রুপসি বাংলা এক্সপ্রেস, শালিমার-আদ্রা এক্সপ্রেস, শালিমার-আদ্রা রাজ্যরানি এক্সপ্রেস(ত্রিসাপ্তাহিক) ট্রেন।

CLOSE COMMENT

ADD COMMENT

To read stories offline: Download Eenaduindia app.

SECTIONS:

  হোম

  রাজ্য

  দেশ

  বিদেশ

  ক্রাইম

  খেলা

  বিনোদন-E

  ইন্দ্রধনু

  অনন্যা

  গ্যালারি

  ভ্রমণ

  জনমত পঞ্চমত ২০১৮

  ଓଡିଆ ନ୍ୟୁଜ

  MAJOR CITIES